দাঁইহাটের গৌরব নবীন চন্দ্র ভাস্কর: দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী গড়া শিল্পী আজও বিস্মৃত ইতিহাসের পাতায়
- May 31
- 3 min read
সংবাদদাতা, কাটোয়া (পূর্ব বর্ধমান) — দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর মূর্তি আজ কোটি ভক্তের শ্রদ্ধার কেন্দ্রে। কিন্তু এই মূর্তির নির্মাতা নবীন চন্দ্র ভাস্কর, যিনি দাঁইহাটের মাটি থেকে উঠে এসেছিলেন, তাঁর জীবন ও জন্মভিটে আজও অনেকাংশে অবহেলার অন্ধকারে। পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত দাঁইহাটে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী কেবল একজন ভাস্কর ছিলেন না, ছিলেন বাংলার ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অসাধারণ নির্মাতা।

১৮৩৫-এর দাঁইহাট থেকে ১৮৫৫-এর দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত
১৮৩৫ সালে দাঁইহাটের ভাস্করপাড়ায় জন্ম নবীন চন্দ্র ভাস্করের। তাঁর পিতা রামধন ভাস্কর কলকাতায় "ওরিয়েন্টাল স্টোন ওয়ার্কস" নামে পাথরের মূর্তি নির্মাণ ও বিক্রির কাজ করতেন। পারিবারিক শিল্প-পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে নবীনের হাতে খড়ি। অল্প বয়সেই — কারো মতে মাত্র ২০ বছর বয়সে — তিনি রানি রাসমণির অনুরোধে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালীমূর্তি নির্মাণ করেন ১৮৫৫ সালে।
মূর্তি নির্মাণের প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। প্রথম দুইবার মূর্তির মাপ নিয়ে অসন্তোষ থাকে, তৃতীয়বার তৈরি হওয়া মূর্তিটিই শেষ পর্যন্ত দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠা পায়। সেই মূর্তিই আজ ভবতারিণী নামে কোটি ভক্তের কাছে পূজিত। বিহারের জামালপুর থেকে বিশেষ কষ্টিপাথর এনে এই মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন নবীন।
ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানো
কাটোয়া মহকুমার প্রাচীন ইতিহাস গবেষক রণদেব মুখোপাধ্যায় বলেন, "রাসমণি–রামকৃষ্ণর আরাধ্য ভবতারিণীর মূর্তি গড়ে নবীন ভাস্কর শুধু শিল্পকৃতিরই স্বাক্ষর রাখেননি, ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধেও শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ ব্রাহ্মণ সমাজের একটা বড় অংশ চাননি, শূদ্রের ঘরণীর ঘরে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা হোক। ব্রাহ্মণদের নিষেধ উপেক্ষা করেই নবীন রানি রাসমণির অনুরোধ রেখেছিলেন।"
সারদা মা-র উদ্ধৃতি হিসেবেও একাধিক সূত্রে উল্লেখ আছে যে নবীন ভাস্কর অত্যন্ত সংযমী জীবনযাপন করতেন — "ঠাকুরের মুখে শুনেছি, নবীন ভাস্কর সারা দিনে বেলা তিনটের সময়ে এক বার মাত্র হবিষ্যান্ন ভোজন করতেন। অত সংযত হয়ে, অত তপস্যা করে তবে দক্ষিণেশ্বরের মা কালীকে বানিয়েছেন।"
বাংলার সর্বত্র বিস্তৃত খ্যাতি
নবীন ভাস্করের খ্যাতি দক্ষিণেশ্বরের মূর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্ধমান রাজবংশ ছাড়াও কাশিমবাজার, নাটোর, পুঁটিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, জেমো, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ, মণিপুর, লালগড়ের রাজপরিবারদের কাছ থেকে তিনি গৃহদেবতা নির্মাণের বরাত পেতেন।
বর্ধমান রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় মঙ্গলকোটের সতীপীঠ ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মূর্তিও তৈরি করেছিলেন নবীন। নির্মাণের জন্য ভালো পাথরের প্রয়োজন মেটাতে আস্ত একটা পাহাড়ই কিনে ফেলেছিলেন বলে ইতিহাস ঘষে।
দক্ষিণেশ্বরের তিনটি কালী — "তিন বোন" এর কাহিনি
নবীন ভাস্কর দক্ষিণেশ্বরের কালীমূর্তি নির্মাণের দুই বছর আগে আরও দুটি কালীমূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। একই কষ্টিপাথরখণ্ড থেকে তিনটি মূর্তি তৈরি হওয়ায় এদের আজও "তিন বোন" বলা হয়। বড় মূর্তিটি হেদুয়ার গুহ বাড়িতে নিস্তারিণী কালী নামে এবং ছোট মূর্তিটি বরানগরের প্রামাণিক ঘাট রোডে ব্রহ্মময়ী কালী নামে আজও পূজিত। ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ব্রহ্মময়ী কালীকে "ছোট মাসি" এবং নিস্তারিণী কালীকে "বড় মাসি" বলে ডাকতেন।
সম্মান ফিরে পেলেন জন্মভিটেয়
সাম্প্রতিক সময়ে দাঁইহাট শহরের ভাস্কর পাড়ায় নবীন ভাস্করের আবক্ষ মূর্তি বসিয়েছে তৃণমূল শাসিত দাঁইহাট পুরসভা। পুরপ্রধান শিশির মণ্ডল বলেছিলেন, "নবীন ভাস্কর আমাদের অহঙ্কার। তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে আমরা বাংলার লুপ্তপ্রায় ভাস্কর্য শিল্পকেও সম্মান জানাচ্ছি।" এই মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন দাঁইহাটের শিল্পী দেবাশিস চন্দ্র, ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে ফাইবার গ্লাস দিয়ে।
অবহেলার ছায়া জন্মভিটেতে
তবুও সম্মানের এই মুহূর্তের পাশাপাশি বাস্তবতা করুণ। অষ্টাদশ শতকে দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করে বাঙালি শিল্পী হিসেবে পরিচিত নবীন ভাস্করের বাড়ি আজ দীপাবলিতেও আঁধারে ডুবে থাকে বলে প্রতিবেদনে জানা যায়।
দাঁইহাট শহরের বাসিন্দা ইতিহাস নিয়ে চর্চাকারী অশেষ কয়াল বলেন, "কাঁচামাল হিসেবে কষ্টিপাথর সংগ্রহের জন্য বিহারের জামালপুরে একটা আস্ত পাহাড়ই কিনেছিলেন নবীন ভাস্কর।" নবীনের সুখ্যাতির জন্য বর্ধমান রাজবংশ ছাড়াও কাশিমবাজার, নাটোর, পুঁটিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, জেমো, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ, মণিপুর, লালগড় রাজপরিবারের কাছ থেকে তিনি গৃহদেবতা নির্মাণের বরাত পেতেন।
সম্পাদকীয় মন্তব্য: স্মৃতি শুধু উদযাপন নয়, সংরক্ষণ
নবীন চন্দ্র ভাস্করের জীবনগাথা আমাদের দুটি সত্য মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন এমন অগণিত অজ্ঞাত শিল্পী, যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় আজও স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি। দ্বিতীয়ত, স্মৃতি শুধু উদযাপন করলেই টিকে থাকে না — সংরক্ষণের দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নবীন ভাস্করের বর্তমান প্রজন্ম তো বটেই, ভাস্কর্য শিল্পের জন্য এককালের বিখ্যাত দাঁইহাট ভাস্কর্য শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়েছে। এই বংশের শেষ শিল্পী ছিলেন শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ ভাস্কর।
দাঁইহাটের মাটি বহু ইতিহাস বুকে লালন করেছে। নবীন চন্দ্র ভাস্কর তাই শুধু এক ব্যক্তি নন; তিনি দাঁইহাটের গর্ব, বাংলার গৌরব এবং এক বিস্মৃত শিল্প-অধ্যায়ের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীর্ণ বাড়ি আজও দাঁইহাটের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্ন করে — আমরা কি আমাদের ঐতিহ্যকে শুধু উদযাপন করি, নাকি সংরক্ষণও করি?


Comments